ঢাকার শিল্প
বাংলার প্রাচীন রাজধানী যদিও মুনিম খান খান খানানের সময়ে এমনভাবে বিরান হয় যে হুমায়ুনের শখের এই জান্নাতাবাদ' একেবারেই ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয় এবং পরে আর কখনই এ স্থান জনবসতির মুখ দেখে নাই। সোনারগাঁ' কিছু দিনের জন্য পূর্ব বাংলার রাজধানী ছিল কিন্তু আজ সেটিও একটি গ্রাম বা মামুলি ছোট শহরের (কসবা) বেশি নয়। পাঠান শাসনামলে তাণ্ডা, ফতেহাবাদ, সাতগাঁ ইত্যাদি স্থানে রাজধানী, টাকশাল স্থাপিত হতে থাকে কিন্তু আজ এগুলির নাম নিশানা নেই বরং কিছু কিছু স্থানের অবস্থান নির্ধারণ করাও যায় না। কিন্তু ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য যে প্রত্যেক আমলে ও যুগে ঢাকা জাঁকজমক ও আড়ম্বরপূর্ণ এবং স্বপরিচয়ে টিকে ছিল। অবশেষে মুর্শিদকুলী খান যখন মাখসুসাবাদ নামক সাধারণ একটি গ্রামকে (কসবা) বাংলার রাজধানী হিসাবে নির্বাচন করেন এবং অতি শীঘ্রই তা মুর্শিদাবাদ নামে এক বিরাট শহরে পরিণত হয়, তখনও ঢাকা এভাবে মুছে যায়নি যে, নাম নিশানাহীন হয়ে যাবে। এর কারণ কিছুটা ঢাকার ভৌগোলিক গুরুত্ব এবং বেশিটা ঢাকার শিল্পকার্যের শ্রেষ্ঠত্ব। সারা হিন্দুস্তানের যে শহরেই যান না কেন, প্রত্যেক জায়গাতেই এক দু'টি প্রসিদ্ধ শিল্প পাওয়া যাবে কিন্তু আমি আপনাদের বলতে চাইছি যে, ঢাকা এত ধরনের শিল্পে (বৃত্তিতে) শ্রেষ্ঠত্ব রাখত এবং এখনও রাখে যে তার পূর্ণ তালিকার জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন এবং এ মুহূর্তে এটি আমাদের বিষয় নয়।
যাহোক হিন্দুস্তানী দরবারসমূহে সব সময়ের জন্য এই বিশিষ্টতা ছিল যে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সব ধরনের শিল্পকলা এবং সব রকমের কলাকৌশলের উন্নতি ঘটেছে।
প্রত্যেক দরবারে গুণীজনদের ভীড় থাকত এবং এই দরবারের দেখাদেখি এ জনপ্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা এক ধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। ফলে ছোট ছোট আমীরগণ পর্যন্ত গুণীদের এমন সমাদর করতেন যে, আজ শুনে অবাক হতে হয়।
একথা সকলেই জানেন যে, মসলিনের সঙ্গে ঢাকার নাম সম্পৃক্ত রয়েছে এবং পৃথিবী যতদিন আছে ততদিন এই সম্পৃক্ততা দূর হবার নয়। মসলিন কিভাবে তৈরি হতো, কোন সময় থেকে বয়ন শুরু হয়েছে, আর যে তুলা এই মসলিনে ব্যবহৃত হতো, তা কোথায় উৎপন্ন হতো, কি কি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হতো, কোন্ লোকেরা বয়ন করত, আর কত বয়স পর্যন্ত বয়ন করত, এগুলি এবং এছাড়া অন্যান্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ের বর্ণনা আমাদের বিষয়বস্তু বহির্ভূত। আমার শুধু এটুকু বলবার আছে যে, আমার বাল্যাবস্থায় এমন কোনো তাঁতি জীবিত ছিল না যে মসলিনের জন্য সুতা তৈরি করতে পারত। অবশ্য হাতে প্রস্তুত সুতার কিছু প্রাচীন ভাণ্ডার রয়ে গিয়েছিল যা দিয়ে এক আধ থান (কাপড়) তৈরি হতে পারত। আমার বাল্যকালের অনেক আগে থেকেই বিলেতি সুতার আগমন শুরু হয়েছিল এবং তা থেকেই মসলিন বানানো হতো এবং তাও মসলিনের সব ধরন নয় যেমন: শবনম, আবরওয়া' প্রস্তুত হ'তে পারত না। এক প্রকারের মসলিনকে হিন্দুস্তানে জঙ্গলবাড়ি বলা হয়। জঙ্গলবাড়ি' গ্রাম আজও ময়মনসিংহ জেলায় বিদ্যমান, যেখানে বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খান মসনদে আলীর বংশধরগণ আশ্রয় নিয়েছিলেন। একই দরবারি বৈশিষ্ট্য এখানেও কার্যকর ছিল যে, মসলিন শিল্প ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং স্থানের নামকরণে এই মসলিনকে জঙ্গলবাড়ি বলা হতো। অনুরূপভাবে কাগমারি পরগণা, যা পশ্চিম ময়মনসিংহের টাংগাইল মহকুমার প্রসিদ্ধ জায়গা, সূক্ষ্ম কাপড় তৈরির ব্যাপারে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এখানে এটা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ঢাকা শহর থেকে ছয় মাইল পশ্চিমে তুরাগ নামে এক নদী প্রবাহিত রয়েছে, যা ময়মনসিংহ জেলার আসিং পরগণার যমুনা নদী থেকে উৎপন্ন হয়েছে এবং ঢাকার আটীর সামনে বুড়িগঙ্গায় এসে মিলিত হয়েছে। এই নদীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, এর তীর বরাবর বাংলার বড় বড় জমিদার, মুসলিম নেতাদের এবং কিছু হিন্দু ধনী পরিবারের অধিবাস রয়েছে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments